উমর ইবনে খাত্তাবের মৃত্যুর পর গঠিত পরামর্শক পর্ষদ ও জামালের যুদ্ধের লোকদের সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত প্রশধ্বংসা আল্লাহর যার দৃষ্টি থেকে একটা আকাশ অন্যটিকে এবং একটা পৃথিবী অন্যটিকে গোপন করে রাখতে পারে না । কেউ একজন আমাকে বললো, “হে আবি তালিবের পুত্র, তুমি খেলাফতের জন্য লোভাতুর’ হয়ে পড়েছে।” আমি তাকে বললামঃ আল্লাহর কসম, তুমিই বরং অনেক দূরবর্তী (অনধিকারী) হওয়া সত্ত্বেও অধিক লোভাতুর । অপরপক্ষে, আমি এর সুযোগ্য ও নিকটবতী (অধিকারী) । আমি আমার অধিকার হিসাবে খেলাফত দাবি করেছি। অপরপক্ষে, আমার ও খেলাফতের মধ্যে তোমরা অবৈধ হস্তক্ষেপ করছে এবং আমার মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে । যখন আমি উপস্থিত জনতার সনুখে যুক্তি দ্বারা তার কানে আঘাত করলাম তখন সে চমকে উঠলো এবং কী জবাব দেবে তা খুঁজে না পেয়ে যেন হতবুদ্ধি হয়ে গেল । হে আল্লাহ কুরাইশ ও তাদের সাহায্যকারীদের বিরুদ্ধে আমি তোমার সাহায্য প্রার্থনা করি। তারা আমার আত্মীয়তার অধিকার অস্বীকার করেছে, আমার মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছে এবং খেলাফতের ব্যাপারে আমার বিরোধিতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। অথচ খেলাফত আমার অধিকার । তারপর তারা আমাকে
বললো, “জেনে রাখো, তোমার খেলাফত পাওয়া অথবা তা পরিত্যাগ করা—দু-ই ন্যায়সঙ্গত ।” জামালের জনগণের বর্ণনা
তারা (তালহা, জুবায়ের ও তাদের সমর্থকগণ) আল্লাহর রাসুলের স্ত্রীকে এমনভাবে হেঁচড়ে বের করে এনেছিল যেন কোন ক্রীতদাসীকে বিক্রির জন্য নেয়া হচ্ছিলো। তারা তাকে বসরা নিয়ে গিয়েছিল যেখানে ওদুটোর (তালহা ও জুবায়র) স্ত্রীরা ঘরের মধ্যে ছিল, কিন্তু আল্লাহর রাসুলের স্ত্রীকে তাদের ও সৈন্যদের মাঝে প্রকাশ্যভাবে নিয়ে এলো। অথচ এদের মধ্যে একজন লোকও ছিল না। যারা স্বেচ্ছায় ও বিনা বাধ্যবাধকতায় আমার হাতে বায়াত গ্রহণ করে নি।
বসরায় এসে তারা আমার গভর্নর, কোষাধ্যক্ষ ও অন্যান্য অধিবাসীকে আমার বিরোধিতা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিল। তারা কতেক লোককে আটক করে এবং কতেক লোককে বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করেছিল। আল্লাহর কসম, যদি তারা বিনা দোষে ইচ্ছাকৃতভাবে একজন মুসলিমকেও হত্যা করে থাকে তবে তাদের সকল সৈন্যকে হত্যা করা আমার জন্য বৈধ হবে। কারণ, তারা বিনা দোষে হত্যায় উপস্থিত ছিল কিন্তু দ্বিমত পোষণ করে নি এবং মুখে অথবা হাতে কোন প্রকার বাধার সৃষ্টি করে নি। বিনা দোষে মুসলিমগণকে হত্যা করার জন্য যে সসংখ্যক লোক এগিয়ে এসেছিল তাদের কথা বলাই বাহুল্য।
১। উমর ইবনে খাত্তাবের মৃত্যুর পর তাঁর মনোনীত পরামর্শক পর্যদের বৈঠকে সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস উমরের একটা উক্তি বারবার আমিরুল মোমেনিনকে শুনাচ্ছিলেন যা উমর তাঁর মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন। উমর বলেছিলেন, “হে আলী, খেলাফতের জন্য তুমি বড়ই লোভাতুর।” তখনই আলী প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, “কেউ নিজের অধিকার দাবি করলে তাকে লোভাতুর বলা যায় না। বরং তাকেই লোভী বলা যায় যে আমার ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায় প্রতিহত করছে এবং অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও খেলাফতকে আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছে।” এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, আমিরুল মোমেনিন খেলাফতকে তার ন্যায়সঙ্গত অধিকার মনে করতেন এবং তার অধিকার হিসাবে খেলাফত দাবি করতেন। কোন অধিকার আদায়ের দাবি উত্থাপনের জন্য সে অধিকার উড়িয়ে দেয়া যায় না এবং খেলাফত থেকে তাকে বঞ্চিত করার জন্য তার দাবিকে ওজর হিসাবে দাড় করানো যায় না এবং তার দাবিকে লোভ হিসাবে আখ্যায়িত করা যায় না। ধরা যাক, তার দাবি লোভের কারণে তিনি উত্থাপন করেছেন, তা হলে এ লোভ থেকে কি কেউ মুক্ত ছিল? মুহাজির ও আনসারগণের মধ্যে দড়ি-টানাটানি, পরামর্শক পর্ষদের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সংগ্রাম এবং তালহা ও জুবায়রের কুচক্র কি লোভের ফল নয়? যদি খেলাফতের প্রতি আমিরুল মোমেনিনের কোন লোভ থাকতো তাহলে আব্বাস (রাসুলের চাচা) ও আবু সুফিয়ান যখন বায়াত গ্রহণ করতে এসেছিল তখন তিনি সকল পরিণামের প্রতি চোখ বন্ধ করে খেলাফত গ্ৰহণে রাজি হতেন এবং তৃতীয় খলিফার মৃত্যুর পর যখন মানুষ তাঁর কাছে ছুটে এসে ভিড় জমিয়ে বায়াত গ্রহণের জন্য চাপ দিয়েছিলো তখন তিনি বিরাজমান অবস্থার অবনতির কথা বিবেচনা না করেই তাদের প্রস্তাবে রাজি হতেন। আমিরুল মোমেনিনের পূর্বাপর পদক্ষেপসমূহের কোনটিতেই এটা প্রমাণিত হবে না যে, তিনি শুধুমাত্র খলিফা হবার জন্যই খেলাফত দাবি করেছিলেন। বরং খেলাফতের জন্য তার দাবির উদ্দেশ্য ছিল এর বৈশিষ্ট্য যেন পরিবর্তত হয়ে না পড়ে এবং দ্বিন যেন অন্যদের লালসার শিকার না হয়ে পড়ে। খেলাফত দ্বারা জীবনের আনন্দ ও আরাম-আয়েশ উপভোগের উদ্দেশ্য থাকলেই তাকে লোভ বলা যায়। ২। এ উক্তির ব্যাখ্যা লেখতে গিয়ে হাদীদ *** (৯ম খন্ড, পৃঃ ৩০৬) লেখেছে যে, আমিরুল মোমেনিন বুঝাতে চেয়েছেন : তারা (কুরাইশ ও তাদের সাহায্যকারীগণ) আমাকে খেলাফতের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেই তৃপ্ত হয় নি। যা তারা অন্যায়ভাবে দখল করে রেখেছিলো। বরং তারা পাল্টা দাবি তুলেছিল যে, আমাকে খেলাফত দেয়া আর না দেয়া সম্পূর্ণরূপে তাদের এখতিয়ারভুক্ত এবং এ বিষয়ে তাদের সাথে কোন যুক্তির অবতারণা করার অধিকার আমার নেই । আমাকে খেলাফত থেকে সরিয়ে রাখা ন্যায়সঙ্গত কাজ-এ কথাটা অন্তত যদি তারা না বলতো তাহলে আমি সহ্য করতে পারতাম কারণ এতে আমার আধিকার কিছুটা স্বীকার করা হতো যদিও তা সমৰ্পণ করার জন্য কখনো তারা প্ৰস্তৃত ছিল না ।